পরামর্শ নিতে গিয়ে জজের সঙ্গে প্রেম, তারপর বিয়ে—জজ হলেন চৈতি নিজেও
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পরামর্শ নিতে গিয়ে পরিচয়। এরপর প্রথম দেখায় ভালো লাগা, পারিবারিকভাবে বিয়ে—আর এবার সেই স্ত্রীও একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই শিক্ষার্থী উদাস গোস্বামী ও চৈতি বিশ্বাসের গল্পে যোগ হয়েছে এমনই এক নতুন অধ্যায়।
সম্প্রতি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন চৈতি বিশ্বাস। এর আগে তার স্বামী উদাস গোস্বামী ১৬তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ফলে একই দম্পতির দুজনেরই বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
যেভাবে পরিচয়
দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাদের মধ্যে সরাসরি পরিচয় ছিল না। কারণ উদাস গোস্বামী চৈতি বিশ্বাসের চেয়ে কয়েক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন।
উদাস গোস্বামী গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার পর অনেকেই বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে তার কাছে পরামর্শ চাইতেন। চৈতিও একসময় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পরামর্শ নেওয়ার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম দেখা হয়। উদাসের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দেখাতেই চৈতিকে তার ভালো লেগে যায়। এমনকি তখনই তিনি বন্ধুর কাছে চৈতিকে বিয়ে করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে দুই পরিবারের আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়।
স্বামীর কাছ থেকেই পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পরামর্শ
চৈতি যখন বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তার স্বামী উদাস গোস্বামী নিজেও বিচার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতির বিভিন্ন বিষয়ে তিনি চৈতিকে সহযোগিতা করেন।
উদাসের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চেয়েছিলেন চৈতি যেন পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও স্বাচ্ছন্দ্য পান। ঘরের কাজের চাপে যেন তার পড়াশোনা ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
চৈতির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পড়াশোনার পরিকল্পনা, লেখার ধরন, বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধানসহ নানা বিষয়ে উদাস তাকে সহযোগিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এবার স্ত্রীও বিচারক হওয়ার পথে
উদাস গোস্বামী ১৬তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অন্যদিকে, চৈতি বিশ্বাস ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
অর্থাৎ একসময় যিনি স্বামীর কাছে বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পরামর্শ নিতেন, সেই চৈতিই এখন নিজের যোগ্যতায় একই পেশায় প্রবেশের পথে। বিষয়টি তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পেশাগত ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে সামনে এসেছে।
সাফল্যের পেছনে কী ছিল?
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে চৈতির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নিয়মিত পড়াশোনা, ধৈর্য, একাগ্রতা এবং হার না মানার মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বামী উদাস গোস্বামীও শুরু থেকেই বিশ্বাস করতেন, চৈতি তার যোগ্যতা অনুযায়ী ভালো করতে পারবেন।
উদাসের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, তিনি চেয়েছিলেন তার স্ত্রী নিজের মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাক। সে কারণে চৈতির পড়াশোনার সময় তাকে প্রয়োজনীয় পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই পেশায়
উদাস ও চৈতির গল্পের আরেকটি দিক হলো—দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সরাসরি পরিচয় না থাকলেও পরবর্তী সময়ে পেশাগত লক্ষ্য ও বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতির সূত্রে তাদের পরিচয় হয়।
পরিচয় থেকে সম্পর্ক, এরপর বিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত দুজনেরই বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার—পুরো ঘটনাপ্রবাহ তাই অনেকের কাছে ব্যতিক্রমী এক দাম্পত্য ও পেশাগত যাত্রার গল্প হয়ে উঠেছে।
চৈতি বিশ্বাসের ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই গল্পে যোগ হয়েছে নতুন সাফল্য। এখন নিয়োগ-সংক্রান্ত পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি বিচার বিভাগে কর্মজীবন শুরু করবেন।
একসময় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে যে তরুণী একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পরামর্শ নিতেন, সময়ের ব্যবধানে তিনিও একই পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। আর সেই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটই তার জীবনসঙ্গী—উদাস গোস্বামী ও চৈতি বিশ্বাসের গল্পটি তাই শুধু প্রেম ও বিয়ের গল্প নয়, বরং একই সঙ্গে স্বপ্ন, পরিশ্রম ও পেশাগত সাফল্যেরও একটি গল্প।