‘নীল আকাশে ওই যে চাঁদ, ও কি কারো একার?’ ছোটবেলার ছড়ায় এমন প্রশ্ন থাকলেও বর্তমান ভূ-রাজনীতি বলছে না, চাঁদ এখন আর স্রেফ জোছনা বিলাইবার বস্তু নয়; চাঁদ এখন শক্তির মহড়া দেওয়ার নতুন ময়দান।
১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের বুকে প্রথম পা রেখেছিলেন, তখন সেটি ছিল মানবজাতির জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। কিন্তু তার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল ইগো এবং প্রতিযোগিতা।
আজ অর্ধশতাব্দী পর ‘আর্টেমিস-২’ যখন উৎক্ষেপণের অপেক্ষায়, তখন আবারও ইতিহাসের সেই একই সুর বাজছে,তবে এবার প্রতিপক্ষ ভিন্ন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম যুক্তরাষ্ট্র; বিংশ শতাব্দীর সেই স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ এখন বেইজিং বনাম ওয়াশিংটনে মোড় নিয়েছে। চীনের জাতীয় মহাকাশ প্রশাসন যখন ঘোষণা করলো ২০৩০ সালের মধ্যে তারা চাঁদে মানুষ পাঠাবে, তখন যেন ওয়াশিংটনের ড্রয়িংরুমে নতুন করে সাইরেন বেজে উঠলো।
আর সেই ঘোষণার পরই তড়িঘড়ি করে আর্টেমিস-২ মিশনকে ত্বরান্বিত করা হলো। মহাকাশ বিজ্ঞান কি তবে স্রেফ বিজ্ঞানের জন্য? নাকি এটি কেবল ক্ষমতার এক পরোক্ষ যুদ্ধ বা ‘প্যাসিভ ওয়ার’?
তবে ১৯৬৯ সালের সেই জুলাইয়ের রাতটি কেবল বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ছিল না, ছিল মার্কিন দম্ভের এক চরম পরীক্ষা। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘স্পুটনিক’ আর ‘ইউরি গ্যাগারিন’ যখন মহাকাশে একের পর এক বিজয় নিশান ওড়াচ্ছিল, তখন ওয়াশিংটনের পিঠ ঠেকে গিয়েছিল দেয়ালে। সেই হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের নামই ছিল ‘অ্যাপোলো-১১’।
নীল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের বুকে প্রথম কদম রাখলেন, সেটি স্রেফ কোনো মানুষের পদচিহ্ন ছিল না, সেটি ছিল আমেরিকার পক্ষ থেকে মস্কোকে দেওয়া এক বিশাল রাজনৈতিক বার্তা। সেই সময় বিজ্ঞান ছিল গৌণ, মুখ্য ছিল কে আগে পৌঁছাবে? কে জয় করবে পৃথিবীর বাইরের এই আদিম মরুভূমি? আজকের আর্টেমিস যেন সেই পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধেরই এক ডিজিটাল সংস্করণ।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে নাসা কেন আর চাঁদে মানুষ পাঠানোর তাগিদ অনুভব করেনি। উত্তরটা খুব সহজ ,প্রতিযোগিতা করার মতো পাশে কেউ ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশে অনেকটা ‘একচ্ছত্র সম্রাট’ হিসেবে রাজত্ব করেছে। তখন চাঁদে যাওয়ার চেয়ে পৃথিবীতে প্রভাব বাড়ানোই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। কোনো প্রতিপক্ষ নেই, তাই জেতার তাড়নাও ছিল না। কিন্তু চীনের ‘স্পেস ড্রিম’ আমেরিকার সেই একঘেয়েমিতে ধাক্কা দিয়েছে।
বিংশ শতাব্দীতে মহাকাশ জয় ছিল সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদের লড়াই। আর এখনকার লড়াইটা আধিপত্যের। চীন যখন ২০৩০-এর ডেডলাইন দিলো, যুক্তরাষ্ট্র তখন তড়িঘড়ি করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নেশায় নামলো। আর্টেমিস-২ কেবল একটি রকেট নয়, এটি আসলে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দেওয়া এক কড়া জবাব।
প্রতিযোগিতা ছাড়া যেমন জয়োৎসব জমে না, তেমনি প্রতিপক্ষ ছাড়া মহাকাশ জয়ের খরচ মেটাতেও আগ্রহী ছিল না হোয়াইট হাউস। কিন্তু আজ ড্রাগনের দেশ চীন যখন ২০৩০-এর ডেডলাইন হাতে নিয়ে মহাকাশে নিজেদের আধিপত্যের জানান দিচ্ছে, ঠিক তখনই নাসার ঘুম ভেঙেছে। এই তড়িঘড়ি করে চাঁদে ফেরার তাড়না প্রমাণ করে , মহাকাশ জয় মানব কল্যাণের চেয়ে বেশি ‘শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট’ পাওয়ার নেশা।
প্রশ্ন ওঠে, মানবজাতির এই যে তথাকথিত ‘বিপ্লব’, তা কি সত্যিই জ্ঞানের সন্ধানে? নাকি কেবল অন্যের চেয়ে এক কদম এগিয়ে থাকার মরিয়া চেষ্টা?
চাঁদের মাটিতে ধুলো উড়বে, মানুষের পায়ের ছাপ পড়বে ঠিকই। কিন্তু সেই ছাপের নিচে কি লেখা থাকবে মহাকাশ বিজ্ঞানের জয়গান? নাকি লেখা থাকবে দুই পরাশক্তির জেদ আর দম্ভের গল্প? আর্টেমিস-২ এর ইঞ্জিনের গর্জনে আমরা হয়তো আবারও শুনছি সেই পুরোনো কথা ‘আমরাই সেরা’।
মানুষের এই মহাকাশ যাত্রা কি তবে কেবল একটি ‘প্যাসিভ ওয়ার’ বা পরোক্ষ যুদ্ধের মঞ্চ? আমরা হয়তো একে ‘হিউম্যান রেভল্যুশন’ বা মানবজাতির বৈপ্লবিক উন্নতি বলছি, কিন্তু দিনশেষে মহাকাশ বিজ্ঞান যখন ভূ-রাজনীতির শিকলে বন্দি হয়, তখন স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে আসে। যখন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না, তখন চাঁদের মাটি আর বিজ্ঞানীদের ল্যাবে কোনো প্রাণের স্পন্দন থাকে না, নাসা’র গত কয়েক দশকের নীরবতা সেই রূঢ় সত্যেরই সাক্ষী।
কিন্তু চীন একটি চাল দিলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার পাল্টা চাল দিতেই হয়, এটি যেন এক মহাজাগতিক দাবার বোর্ড। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা কি তবে কেবল তখনই সচল হয় যখন কারো ‘ইগো’তে আঘাত লাগে? আর্টেমিস-২ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মহাকাশ জয় মানে আসলে পৃথিবীর ক্ষমতাকে আকাশ পর্যন্ত প্রসারিত করা।
চাঁদ হয়তো হাসে, কারণ যুগে যুগে মানুষ পাল্টায়, দেশের নাম পাল্টায়, কিন্তু মানুষের দখলদারিত্বের আকাঙ্ক্ষাটা সেই নীল আর্মস্ট্রংয়ের সময় যা ছিল, ২০৩০-এও হয়তো তাই থাকবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা ।

Reporter Name 












