বাপের চেয়েও বেশি বয়সী মানুষকে প্রেম? বয়সের বড় ব্যবধানের সম্পর্ক নিয়ে যা জানা যায়
“বাপের চেয়েও বেশি বয়সী মানুষকে তো কেউ রোমান্স করার কথা ভাবেও না”—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য প্রায়ই দেখা যায়। বিশেষ করে কোনো তরুণী যখন নিজের চেয়ে অনেক বেশি বয়সী কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তখন বিষয়টি দ্রুত মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। শুরু হয় নানা প্রশ্ন, আলোচনা এবং কখনো কখনো তীব্র সমালোচনাও।
তবে বাস্তবতা হলো, প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের মধ্যে বয়সের বড় পার্থক্য থাকলেই সেই সম্পর্ককে অস্বাভাবিক বা অবৈধ বলা যায় না। বিভিন্ন সমাজে এমন সম্পর্কের উদাহরণ রয়েছে। সম্পর্কটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, দুজনের সম্মতি আছে কি না এবং সেখানে কোনো প্রতারণা বা জবরদস্তি রয়েছে কি না—এসব বিষয় বয়সের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের লেখা বিশ্লেষণেও দেখা যায়, কিছু তরুণ-তরুণী নিজের চেয়ে অনেক বেশি বয়সী মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। এর পেছনে ব্যক্তিগত পছন্দ, মানসিক নিরাপত্তার অনুভূতি, পরিণত আচরণের প্রতি আকর্ষণসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে প্রত্যেক বয়সের ব্যবধানের সম্পর্ককে একই মনস্তাত্ত্বিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তরুণী ও বয়স্ক পুরুষের ছবি কিংবা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ নিজের মতো করে গল্প তৈরি করতে শুরু করেন। কেউ সেটিকে প্রেম বলেন, কেউ আবার পারিবারিক সম্পর্ক বলে দাবি করেন। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছাড়া শুধু ছবি বা বয়সের পার্থক্য দেখে সম্পর্কের প্রকৃতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এরকম ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় বয়সের ব্যবধান নিয়ে। সমাজে সাধারণত কাছাকাছি বয়সের নারী-পুরুষের সম্পর্ককে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে বয়সের ব্যবধান অনেক বেশি হলে মানুষের চোখে সেটি ব্যতিক্রমী মনে হয়। ফলে সম্পর্কের ব্যক্তিগত বিষয়টি খুব দ্রুত জনসম্মুখের আলোচনায় চলে আসে।
বয়সের ব্যবধান নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক হলো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা আশপাশের মানুষ আপত্তি জানাতে পারেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মেনে নেয়। অর্থাৎ একটি সম্পর্কের সামাজিক প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে পরিবার, সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের সিদ্ধান্তের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সম্পর্ককে মূল্যায়নের সময় শুধু বয়সের পার্থক্য দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। দুজনের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, বিশ্বাস এবং নিরাপত্তা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বয়সের ব্যবধান অনেক বেশি হলে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, কোনো নারী বা পুরুষ যদি নিজের চেয়ে অনেক বেশি বয়সী কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন, সেটি নিয়ে কটূক্তি বা অপমান করা সমস্যার সমাধান নয়। একইভাবে সম্পর্কের আড়ালে প্রতারণা, চাপ, শোষণ বা জবরদস্তির অভিযোগ থাকলে সেটিও শুধু “ভালোবাসা” বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ বিবেচনা করা জরুরি।
বিনোদনজগতেও বড় বয়সের ব্যবধানের সম্পর্ক নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। ভারতীয় অভিনেত্রী শ্রুতি দাস ও পরিচালক স্বর্ণেন্দু সমাদ্দারের সম্পর্ক নিয়েও একসময় বয়সের পার্থক্যকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা হয়েছিল। আবার সোহিনী দাশগুপ্ত ও প্রয়াত পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রায় ৩৫ বছরের বয়সের ব্যবধান নিয়ে সামাজিক মন্তব্যের কথা উঠে এসেছে।
তাই “বাপের চেয়েও বেশি বয়সী মানুষকে কেউ রোমান্স করে না”—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বয়সের ব্যবধান বেশি হওয়া নিঃসন্দেহে একটি সম্পর্ককে ব্যতিক্রমী করে তুলতে পারে, কিন্তু সেটিই সম্পর্কের সত্যতা বা মান নির্ধারণ করে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সম্পর্কটি যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতি, সম্মান ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়, তাহলে সেটিকে নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে তাদের ব্যক্তিগত বাস্তবতাটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভাইরাল ছবি বা অসম্পূর্ণ গল্প দেখেই সেটিকে নিশ্চিত প্রেমের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকাই দায়িত্বশীল আচর