ই’তিহাসের এক অ’/দ্ভু’ত ও নি’/র্মম পরিহাস! … See more

ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও নির্মম পরিহাস! সময় বদলালে বদলে যায় ক্ষমতার হিসাব

ইতিহাস কখনো একই জায়গায় স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় মানুষের অবস্থান, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ক্ষমতার কেন্দ্র। আজ যে ব্যক্তি বা দল ক্ষমতার শীর্ষে, সময়ের পরিক্রমায় তাকেই হয়তো অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। আবার যাকে একসময় রাজনৈতিকভাবে দুর্বল মনে করা হয়েছিল, ইতিহাসের অন্য অধ্যায়ে তিনিই হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

এই কারণেই ইতিহাসকে অনেক সময় নির্মম শিক্ষক বলা হয়। কারণ ইতিহাস কাউকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাবান কিংবা স্থায়ীভাবে পরাজিত করে রাখে না। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সময়ের পরিবর্তন একসময় এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে একসময় পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তিকে পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় দেখা গেছে। কোনো সিদ্ধান্ত একসময় রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও পরে সেটিই সমালোচনার কারণ হয়েছে। আবার যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একসময় আন্দোলন হয়েছে, সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয়। একটি সরকার বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা পরিবর্তিত হতে পারে। একইভাবে বিরোধী দল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে একসময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯০-এর গণআন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দশকে এমন বহু নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। এর মধ্যে সরকার পরিবর্তন, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক জোটের পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, রাজনীতিতে আজকের অবস্থান আগামী দিনের অবস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না।

রাজনীতির এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়ের শিক্ষা থেকে শেখা। কারণ কোনো রাজনৈতিক শক্তি যখন দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি না হতে দেওয়া। জনগণের মতামত, বিরোধী মত এবং সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিলে একসময় সেই দূরত্ব রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। ক্ষমতায় না থাকা অবস্থায় যে রাজনৈতিক নীতি বা দাবিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই একই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসতে পারে। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এখানেই—মানুষ অনেক সময় নিজের অতীত অবস্থান ভুলে যায়, কিন্তু ইতিহাস তা ভুলে না। পুরোনো বক্তব্য, সিদ্ধান্ত, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান পরবর্তী সময়ে নতুন পরিস্থিতিতে ফিরে আসে এবং নতুন করে মূল্যায়িত হয়।

তবে ইতিহাসের দিকে তাকানোর অর্থ কেবল কারও ভুল খুঁজে বের করা নয়। বরং অতীতের ভুল থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়াই ইতিহাস চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। একটি দেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা প্রয়োজন।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত সংঘাতে পরিণত করা কোনো দেশের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। বাংলাদেশের অতীতের বহু রাজনৈতিক ঘটনা সেই শিক্ষা বারবার সামনে এনেছে।

আজকের প্রজন্মের জন্যও এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পুরোনো ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে নতুন করে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেক সময় একটি ছবি, একটি বক্তব্য কিংবা একটি অসম্পূর্ণ তথ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। অথচ কোনো ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট জানতে হলে তার সময়কাল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখতে হয়।

তাই ‘ইতিহাসের নির্মম পরিহাস’ বলতে শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের পতনকে বোঝানো উচিত নয়। বরং এটি সময়ের এমন এক বাস্তবতা, যেখানে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, মানুষের অবস্থান বদলায় এবং ক্ষমতার সমীকরণ নতুন করে লেখা হয়।

সবশেষে বলা যায়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। আজকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়তো আগামী দিনের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তাই ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা—দুই অবস্থাতেই দায়িত্বশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সময়ের চাকা ঘুরতেই থাকে। আজকের বিজয়ী আগামীকাল পরাজিত হতে পারেন, আবার আজকের পরাজিত শক্তিই ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ পেতে পারে। আর এই পরিবর্তনের মধ্যেই ইতিহাস বারবার মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ইতিহাস সবকিছু মনে রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *